মাদারগঞ্জে ইজিপিপি প্রকল্পের অনিয়ম-দুনীতি; কোটি টাকা বঞ্চিত শ্রমিক

কোটি টাকার মজুরী থেকে বঞ্চিত হাজারও অতিদরিদ্র শ্রমিক

madarganj
ফাইল ছবি

জামালপুরের মাদারগঞ্জে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের অতিদরিদ্রদের জন্য চল্লিশ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচী প্রকল্প বাস্তবায়নে ইউপি চেয়ারম্যান, প্রকল্পের সভাপতি ও ব্যাংক ম্যনেজারদের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে কোটি টাকার মজুরী থেকে হাজারও শ্রমিক বঞ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে অতিদরিদ্র শ্রমিকরা বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ভেস্তে গেছে সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

মাদারগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দ্বিতীয় দফায় অতিদরিদ্রদের জন্য চল্লিশ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচী প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের ৩ হাজার ৩শ’ ৯৩ জন শ্রমিকের মজুরী বাবদ ২ কোটি ৭১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা, সর্দার মজুরী ১ লাখ ২৬ হাজার টাক, নন ওয়েজ কস্ট ১৪ লাখ ৪১ হাজার ১শ’৫৯ টাকাসহ মোট ২ কোটি ৮৭ লাখ ১১ হাজার ১শ’ ৫৯ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রথম দফাতেও একই অংকের টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। সব মিলিয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫ কোটি ৭৪ লাখ ২২হাজার ৩শ ১৭ টাকা এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়।

- Advertisement -

স্থানীয়দের অভিযোগ, অতিদরিদ্র নারী-পুরুষ শ্রমিকদের দিয়ে এই প্রকল্পের কাজ মাটি দ্বারা কাঁচা সড়ক কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ ভরাটের নিয়ম থাকলেও প্রকল্পের নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলার হাজারও শ্রমিকের কোটি টাকা লুটপাট হওয়ায় অতিদরিদ্র নারী-পুরুষ শ্রমিকরা বঞ্চিত হয়েছে।

গত এক সপ্তাহ সরেজমিনে উপজেলার ৩ নং গুনারীতলা ইউনিয়নের ৪টি ওয়ার্ডের ইজিপিপির তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের কাছে বিষয়টি জানতে খোঁজ নিতে গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। গুনারীতলা ইউনিয়নের ৫ নং মোসলেমাবাদ ওয়ার্ডের নুরেজা বেগম, তার স্বামী বাদশা মিয়া, ফকির মোল্লা, মর্জিনা বেগম, তার স্বামী নজরুল ইসলাম, রবিউল ইসলাম, তার স্ত্রী জিবনা বেগম, বাতাসী বেগম, সোরানা বেগম, চায়না বেগম, আহেলা বেগম, মজনু মোল্লা, তার স্ত্রী সুরাইয়াসহ কমপক্ষে ৩০জন, ১ নং ওয়ার্ডের চরগোপালপুর গ্রামের হাফিজুর রহমান, হামেদ আলী, সোলাইমান, দিপা, ফকির আলীসহ ২০জন, ৩ নং ওয়ার্ডের ফরহাদ মিয়া, তার ভাই জাহাঙ্গীর গোলেছা বেগমসহ অন্যান্য ওয়ার্ডের ইজিপিপি তালিকাভুক্ত শতাধিক নারী-পুরুষ শ্রমিকরা এই প্রতিবেদককে এ অনিয়মের কথা জানান।

আরো সংবাদঃ ঢাকা-জামালপুর রুটে নতুন ট্রেন ‘বঙ্গবন্ধু এক্সপ্রেস’

তারা কোনদিনই মাটির কাটার কাজ করেননি। তারা শ্রমিক মজুরী পাওয়া তো দূরের কথা তারা কিছুই জানেন না। আবার শ্রমিকের তালিকায় স্বামী-স্ত্রীসহ অন্যান্য ব্যক্তিদের নাম থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শ্রমিকের তালিকায় নাম দিয়ে চেয়ারম্যান-মেম্বাররা আমাদের মানসম্মানের ক্ষতি করেছে। আমরা তাদের বিচার চাই। অথচ তাদের নামে ব্যাংকের জমাকৃত টাকা উত্তোলন করে তা আত্বসাত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেওয়ানগঞ্জ নিউজকে বলেন, শুধু ২০১৮-১৯ অর্থবছরই নয় ২০১৬-১৭. ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে এই ইউনিয়নের ৫শতাধিক নারী-পুরুষ শ্রমিকের নাম ইউজিপিপির তালিকাভুক্ত করে ইউপি চেয়ারম্যান ও কতিপয় ইউপি সদস্য প্রতিবছর প্রতিজন শ্রমিকের ১৬ হাজার টাকা মজুরী ভুয়া টিপসহি দিয়ে তাদের ব্যাংক হিসাব থেকে উত্তোলন করে আত্মসাত করেছেন।

ইজিপিপির নিয়মানুযায়ী তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের নামে ব্যাংক হিসাব খোলার পর প্রতি শ্রমিকের হিসাবে মজুরীর টাকা জমা করা হয়। প্রতি সপ্তাহের ৫দিন কাজ শেষে তাদের কাছে থাকা চেকের মাধ্যমে মজুরী উত্তোলন করার কথা। কিন্তু এসব শ্রমিকের কাছে কোন চেক বই দেয়া হয়নি। এমনকি টাকা উত্তোলনের সময় তাদের কাছ থেকে কোন টিপ সহি বা স্বাক্ষর নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ মজুরী বঞ্চিত এসব অতিদরিদ্র নারী-পুরুষ শ্রমিকদের। অথচ ব্যাংক থেকে তাদেরই নামে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংক, মাদারগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মো. শহিদুল ইসলামের কাছে ইজিপিপির তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের নামে খোলা হিসাব থেকে কিভাবে কে এসব টাকা উত্তোলন করেছেন জানতে চাইলে ব্যাংক থেকে শ্রমিকরা টাকা না নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, গুনারীতলা ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের সদস্য মোসলেমাবাদ ও নুরুন্নাহার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ ভরাট প্রকল্পের সভাপতি ইমরান খান বাছেদ শ্রমিকদের মাঝে শ্রমিকদের ব্যাংকে জমাকৃত টাকা সুষ্ঠুভাবে বন্টনের জন্য লিখিত দিয়ে তিন দফায় শ্রমিকদের মজুরী ও সঞ্চয়ের ৪২ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন।

সংশ্লিষ্ট হিসাবধারী ছাড়া টাকা দেয়ার নিয়ম রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শ্রমিকদের টিপ সহি দেয়া চেক জমা দিয়ে বিতরণের জন্য নিশ্চয়তা দেয়ার কারণেই তাকে টাকা প্রদান করা হয়েছে। তিনি যদি শ্রমিকদের মজুরী না দিয়ে থাকেন তার দায়-দায়িত্ব প্রকল্পের সভাপতিই বহন করবেন।

আরো সংবাদঃ দেওয়ানগঞ্জে নির্বাচনী সহিংসতা: নিহত ১, আহত ৫

তবে ব্যাংক ম্যানেজারের বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করে মাদারগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবাযন কর্মকর্তা জাহিদ হাসান বলেন, শ্রমিক ব্যতীত অন্য কারো কাছে টাকা দেয়ার নিয়ম নাই। প্রতিজন শ্রমিকের ব্যাংক হিসাবে মজুরীর টাকা জমা এবং ব্যাংক থেকে তাদের নামে চেক প্রদান করা হয়েছে। হিসাবধারী শ্রমিকরাই তাদের টাকা উত্তোলন করবেন। যদি এর ব্যত্যয় ঘটে এবং অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রকল্প সভাপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শ্রমিকদের টাকা উত্তোলন এবং শ্রমিকরা টাকা না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্পের সভাপতি ও গুনারীতলা ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের সদস্য ইমরান খান বাছেদ বলেন, তিনি নামেমাত্র প্রকল্পের সভাপতি প্রকল্পের কাজ ও শ্রমিকের তালিকা ও মজুরী প্রদানসহ সব কিছু চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন আয়না করেছেন। আমাকে দিয়ে শুধু ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করানো হয়েছে। আমি টাকা উত্তোলন করে সাথে সাথে চেয়ারম্যানকে প্রদান করেছি।

ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে ইউপি সদস্যকে দিয়ে ব্যাংক শ্রমিকদের মজুরী উত্তোলন এবং তাদের না দেয়ার বিষয়ে গুনারীতলা ইউনিয়নের চেযারম্যান জয়নাল আবেদীন আয়নার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শ্রমিকদের মজুরী দেয়া হয়েছে। মাস্টার রোলে তাদের টিপ সহি রয়েছে। কিছু শ্রমিক অস্বীকার করতে পারেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে একটি মহল তার বিরুদ্ধে কিছু কিছু শ্রমিক দিয়ে এসব মিথ্যা অভিযোগ দেয়া হয়েছে। আর যদি শ্রমিকরা মজুরী না পেয়ে থাকেন এর দায়-দায়িত্ব প্রকল্পের সভাপতির। প্রকল্পের সাথে আমার কোন সম্পৃক্ততা নাই।

আরো সংবাদঃ মেয়ের ধর্ষককেই বিয়ে করলেন মা!

অপরদিকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ইজিপিপির তালিকাভুক্ত মাদারগঞ্জ উপজেলার ৭ ইউনিয়নের ইজিপিপি তালিকাভুক্ত ৩ হাজার ৩শ’ ৬৯ জন অতিদরিদ্র নারী-পুরুষ শ্রমিকের মজুরী থেকে প্রতিদিন ২৫ টাকা হিসেবে দুই দফায় ৮০ দিনে ২ হাজার টাকা করে সঞ্চয়ের টাকা হিসাবধারীদের হিসাবে ৬৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা জমা রাখা হয়। বছর শেষে প্রতি জুলাই মাসে এসব টাকা শ্রমিকদেরই উত্তোলন করার কথা থাকলেও ব্যাংক ব্যবস্থাপকদের যোগসাজশে প্রকল্পের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যানরা প্রকল্পের সভাপতিদের দিয়ে তা উত্তোলন করে নিজেরাই আত্মসাত করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

শ্রমিকদের সঞ্চয়ের টাকা উত্তোলনের বিষয়ে সোনালী ব্যাংক মাদারগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মো. শহিদুল ইসলাম দেওয়ানগঞ্জ নিউজকে বলেন, শ্রমিকদের পক্ষে প্রকল্পের সভাপতি এককালীন টাকা উত্তোলন করে নিয়েছেন। এই চিত্র শুধু গুনারীতলা ইউনিয়নই নয়। পুরো উপজেলার ইজিপিপির চিত্র একই বলে অভিযোগ, স্থানীয় সচেতন মহল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি প্রকল্পের তালিকাভুক্ত মজুরী বঞ্চিত শ্রমিকদের।

তারা বলেন, সিংহভাগ ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে এবং জাল টিপসহি দিয়ে প্রতিটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বাররা টাকা উত্তোলন করে তা আত্মসাত করেছেন। তাদের দাবি সঠিক তদারকির মাধ্যমে এবং প্রকল্পের নিয়মানুযায়ী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে হাজার হাজার অতিদরিদ্র শ্রমিক দু’বেলা দু’মুঠো খেতে পারবেন এবং সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে।

তারা ইজিপিপি প্রকল্পের ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমের ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে বিগত ৩ বছর কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতকারী দুর্নীতিবাজ ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চলতি অর্থছরে চলমান প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনের উর্ধতন কর্তৃপক্ষসহ দুর্নীতি দমন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তারা।

আপনার মতামত দিন
- Advertisement -